সাফল্য রবিউলের, অনুপ্রেরণা সবার – সফলতার গল্প

মাস শেষে লাখ টাকার উপরে উপার্জন করতে পারে বলে রবিউলকে আলাদা চোখে দেখে সবাই।

বন্ধু থেকে প্রতিবেশী এবং অন্যান্য শুভাকাক্সক্ষীদের সবার দৃষ্টিতেই রবিউল এখন প্রিয়মুখ হিসেবে খ্যাত। ‘প্রিয়মুখ’ শব্দটি ছোট হলেও এই ছোট শব্দটি অর্জন করতে রবিউলকে বিরামহীন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অসম্ভব কঠোর অধ্যবসয়ের অবসান ঘটিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে আনা রবিউলের গল্পটি অনুপ্রেরণা হিসেবে টনিকের মত কাজে দিবে অনলাইনে সফলতাপ্রত্যাশী সবাকেই।

এমনটাও হতে পারে যে, রবিউলের গল্পটি পড়ে আপনার মনে হবে- সর্বোচ্চ সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেড়ে উঠেও রবিউলের মত উদ্যমীরা সফল হতে পারলে, আমরা কেন নয়?

তো আসুন, রবিউলের সফল হওয়ার গল্প শুনি, গল্প শুনি অনুপ্রেরণার, শুনি বাঁধাজয়ের পরে সীমাহীন আনন্দের গল্পটাও!

 

রবিউলের পারিবারিক অবস্থাঃ

পূর্বেই বলা হয়েছে সর্বোচ্চ সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেড়ে উঠেছে আজকের রবিউল। রবিউল হাসান। টিস্প্রিং এর সফল মুখ। তো সর্বোচ্চ সীমাবদ্ধতার জন্য রবিউলের বাবাকে জীবিকার তাগিদে এমন কোন ছোট পেশা নেই, যা তাকে করতে হয়নি। বেঁচে থাকাটাই যেখানে চ্যালেঞ্জিং, সেখানে ছোট পেশার পরিশ্রমের কাজগুলো অনায়াসেই করতে বাধ্য হয়েছিল রবিউলের বাবা। দিনশেষে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ পূরণটাই ক্ষেত্রবিশেষ ঝুঁকির মধ্যে পড়তো রবিউলের পরিবারের। নবম শ্রেণির শুরুর দিকে রবিউলকেও বাধ্য হয়ে ধান সিদ্ধ করে চাল তৈরি করে বাজারে বিক্রির মধ্য দিয়ে পরিবারকে কিছুটা সহযোগিতার চেষ্টাও করতে হয়েছে তাকে।

 

কঠিন পরিস্থিতিতেও চলতে থাকে পড়াশোনাঃ
বাড়ী থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যেত রবিউল। এভাবে করেই পঞ্চম শ্রেণিতে টেলেন্টপুলে বৃত্তিলাভ সহ পঞ্চম থেকে অস্টম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাসের প্রথম ক্রমিক নাম্বারটিও ছিল তাঁর দখলে। অস্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় যথাক্রমে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিকের গ-ি পেরিয়ে বর্তমানে বগুড়ার সরকারি আযিযুল হক কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগ নিয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

 

ইন্টারনেটের ভূবনে প্রবেশঃ
২০১২ সালে সহপাঠী বন্ধুর নোকিয়া ফোন নিয়ে একটু-আধটু জানাশোনার চেষ্টার মধ্য দিয়ে ইন্টারনেটের জগতে হাতেখড়ি হয় রবিউলের। এরপর গুগল ঘেঁটে পরিচয় হয় অনলাইন আর্নিং এর খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে। ধীরে ধীরে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয় অনলাইন আর্নিং এর কনসেপ্ট নিয়ে। বিভিন্ন আার্টিকেল এবং অনলাইন পোর্টালগুলোতে পদচারণা বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে আগ্রহের তীব্রতাও। ডাব্লিউ থ্রি স্কুলের টিউটোরিয়াল দেখে কোডিং শেখা থেকে শুরু করে গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়েও অল্পবিস্তর কাজ শেখা পর্ব নিয়মিত চলে।

 

আগ্রহের থেকে সীমাবদ্ধতাটাই যেন বেশিঃ
যে বয়সে সহপাঠী বন্ধুরা বিভিন্ন আড্ডা-হৈ-হুল্লোড় করে সময় পার করে, সেই বয়সে টুকটাক শৌখিন চাহিদা পূরণ তো নয়ই, একনিষ্ঠ আগ্রহ নিয়ে অনলাইন ঘেঁটে ইনকামের রাস্তা খোঁজায় ব্যস্ত সময় পার করেও রবিউল পাচ্ছিল না পারিবারিক পর্যাপ্ত সহযোগিতা। মেগাবাইট কিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করাটাও ছিল রবিউলের পক্ষে কষ্টসাধ্য। প্রত্যন্ত গ্রামে ইন্টারনেটের কম গতির সমস্যার চেয়েও, সেই কম গতির ইন্টারনেট সেবা পাওয়াটাই ছিল রবিউলের জন্য বাড়াবাড়ি রকমের দুরূহ বস্তুর মতো।

 

টি-স্প্রিং এর সাথে পরিচয় এবং স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপঃ
২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কোডিং এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখা শেষ হলেও আর্নিং এর দেখা পাচ্ছিল না রবিউল। স্বল্পআয়ের পরিবারে আর্নিংটা ভীষণরকমের প্রয়োজন হওয়া সত্ত্বেও কোনোভাবেই যেন ভাগ্যটা অনুকূলে আসছিলো না। হতাশা নিয়েও লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া বন্ধ করেনি রবিউল। জানুয়ারি ২০১৬ সালের দিকে টি-স্প্রিং এ কাজ শেখা শুরু। ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে এবং গুগলে সার্চ করে আর্টিকেল পড়ে চলতে থাকে টি স্প্রিং নিয়ে পড়াশোনা, ঘাঁটাঘাঁটি। এরই মধ্যে ফেসবুক গ্রুপ টি-স্প্রিং বিডি’র সাথে যুক্ত হয়ে পুরোদমে চলে ট্রিকস শেখা এবং এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বিরামহীন অধ্যবসয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

 

অতঃপর স্বপ্ন পূরণ!
অনলাইন আর্নিং এর সকল পড়াশোনা, ঘাঁটাঘাঁটির অবসান ঘটিয়ে জানুয়ারি ২০১৬-তে টি-স্প্রিং প্লাটফর্মের সাথে পরিচিত হওয়া রবিউল প্রথম সাফল্যের দেখা পায় একই বছরের এপ্রিল মাসে, ৬ ডলার লাভের একটি টি শার্ট সেল করার মধ্য দিয়ে। এরপর ফ্রি মার্কেটিং এর মাধ্যমেই একে একে আসতে থাকে সেল, বাড়তে থাকে সীমাহীন কৌতূহল এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ফ্রি মার্কেটিং-এ কাজ করে অভূতপূর্ব সাফল্যের দেখা পায় রবিউল। একটা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে একমাসে সর্বোচ্চ ৩৫০+ সেল করে তিন হাজার ছয়শত ডলার আর্নিং এর মাধ্যমে চূড়ান্ত মাইলফলকে পৌঁছে যায় রবিউল। অল্প সময়ের ব্যবধানে টি-স্প্রিং থেকে এমন অভাবনীয় সেল আসতে থাকায় খুশিতে আত্মহারা হয় রবিউল, রবিউলের পরিবার এবং সব থেকে বেশি উৎফুল্ল হয় রবিউলের পরিশ্রম! রবিউলকে নিয়ে রিপোর্ট করা হয় বাংলাদেশের সনামধন্ন টিভি চ্যানেল ATN Bangla তেও। সেখানকার ইন্টারভিউতে রবিউল জানায় তার সফলতার গল্প নিয়ে। রবিউলের সফলতার গল্প নিয়ে ATN Bangla তে করা  ইন্টারভিউটি দেখে নিতে পারেন এখান থেকে।

ফ্রি মার্কেটিং দিয়েই সাফল্যের মাইলফলকে!
ফেসবুক গ্রুপ টি-স্প্রিং বিডির সাথে যারা সচেতনভাবে ভাবে সম্পৃক্ত তারা রবিউল সম্পর্কে জানেন হয়তো, কিন্তু যারা রবিউলকে জানে না তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেটি সেটি হচ্ছে- শূন্য থেকে শুরু করে টি-স্প্রিং এর মাধ্যমে ভাগ্য বদল হওয়া রবিউল মার্কেটিং এর পুরোটাই ছিল ফ্রি মার্কেটিং! কখনো পেইড মার্কেটিং করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রবিউল জানায়, পেইড মার্কেটিংও করেছিলাম, কিন্তু পেইড মার্কেটিং- সফল হতে পারিনি! ৪০০ ডলারের একটা ক্যাম্পেইনের পুরোটাই লস হয়েছিল!

 

সবাই যেখানে পেইড মার্কেটিং এর জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকে, রবিউল তাদের জন্য ভিন্নরকমের দৃষ্টান্ত। তাঁর মানে এই নয় যে, পেইড মার্কেটিং করা যাবে না। তবে এটা সত্যি, রবিউলের মত করে ফ্রি মার্কেটিং-এ এরকম অভাবনীয় সফলতা দ্বিতীয়টি কেউ দেখাতে পারেনি। রবিউলের ক্যারিশম্যাটিক পারফরমেন্স মূলত এখানটাতেই!

আর এরই ধারায় রবিউল হয়ে যায় ২০১৭ বছরের বাংলাদেশের টপ সেলার আর ফিচার করা হয় টিস্প্রীং এর অফিসিয়াল ব্লগে। রবিউলের কাজ করার ট্রিক আর সফলতার গল্প নিয়ে সাজানো এই ব্লগটি পড়ে নিতে পারেন আপনিও এখান থেকে।

 

রবিউলকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত অনুভূতিঃ
Teespring এর Country Manager  Zafar Hossain Zafi বলেন, একজন কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে আমার কাছে যে পরিমাণ টুলসগুলো রয়েছে, ওগুলো যদি রবিউলের কাছে থাকতো তাহলে রবিউল অবস্থানগত দিক থেকে আমাকে ছাড়িয়ে যেত! টি-স্প্রিং এর ভূবনে রবিউল বিস্ময়কর এক অসাধারণ প্রতিভা।

Teespring এর Country Ambassador  Mohammad Korhsed Alam জানায়, রবিউল প্রকৃতপক্ষেই সর্বোচ্চ ডেডিকেটেড একটা ছেলে। যে পরিবার থেকে রবিউল উঠে এসেছে, ওর মত পরিবারের বেশিরভাগই ঝড়ে যায়। রবিউল ঝড়ে যায়নি। যার প্রমাণ সে তাঁর কাজ দিয়ে দিয়েছে এবং নিয়মিতই দিয়ে যাচ্ছে।

 

কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেনি রবিউলওঃ
অন্যদের থেকে আগ্রহের পরিমাণটা একটু বেশিই ছিল রবিউলের। তাই রবিউলকে সহযোগিতা করেছিল জাফি ডিজিটাল বিশেষ করে জাফর হোসাইন জাফি সহ অন্যরা। Zafidigital এর পেইড কোর্স ফ্রিতে সরবরাহ করা হয়েছিল রবিউলের জন্য। রবিউলের ভাষায়, আমার আজকের সাফল্যের পিছনে জাফি ভাইয়ার তথা Zafidigital এর অবদান ছিল অসামান্য। কাজ হয়তো আমি পরিশ্রম করেই শিখেছি, কিন্তু তারা বিভিন্নভাবে যে পরিমাণ সাপোর্র্ট আমাকে দিয়েছে, তা কখনই অর্থমূল্য দিয়ে যাচাই করা যাবে না। তাই সবসময়ের জন্যই আমার সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা থাকবে জাফি ডিজিটালে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।

 

বাবা-মায়ের সাপোর্ট ছিল অতুলনীয়’ জানালেন রবিউলঃ
বর্তমানের অবস্থানে পৌঁছে রবিউল এখন সন্তোষজনক আয়ের অধিকারী হলেও, একটা সময়ে তাকে কতটা চ্যালেঞ্জিং এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা পূর্বেই বলা হয়েছে। সর্বোচ্চ দুঃসময়ের সেই দিনগুলোতে বাবার পরিশ্রমের টাকা এবং বাড়িতে থাকা শাক-সবজি এবং ডিম বিক্রির টাকাও রবিউলের হাতে তুলে দিয়েছিল তার মা। বাবা-মায়ের এইসব অবদানের কথাও দফায় দফায় বলে যাচ্ছিলেন রবিউল। দুঃসময়ের কঠিন মুহূর্তে মেগাবাইট কিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করা রবিউলদের মত পরিবারের পক্ষে নিছক বিলাসিতার মতই মনে হয়। কিন্তু সবকিছুর পরও সন্তান রবিউলের উপর আস্থা রেখেছিল তাঁর পরিবার। রবিউলও তাঁর ইস্পাত সমান দৃঢ়তার সাথে আপোষ করেনি। যার ফলশ্রুতিতে পরিবারের প্রতি তাঁঁর আস্থার দাম দ্বিগুণই শুধু নয়, অগণিত পরিমাণ ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল সে।

 

অনলাইনে সফলতাপ্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে রবিউলের অভিমতঃ
দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে আজকের অবস্থানে উঠে আসা রবিউল বলেন, জেদ এবং পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে যে কারো পক্ষেই সফল হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে লেগে থাকতে হবে। হাল ছেড়ে দিলেই শেষ।

 

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছার বিষয়েও রয়েছে আকাঙ্খাঃ
একদম প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা রবিউল জানে স্বল্পআয়ের মানুষদের শূন্যতা সম্পর্কে। তাই রবিউলের মত উদ্যমী এবং মেধাবী যারা আছে অদূর ভবিষ্যতে তাদের জন্য কাজ করার ইচ্ছার কথা জানালেন রবিউল। সাধ্যমত নি¤œবিত্ত পরিবারের মেধাবীদের স্বাবলম্বী করতে চেষ্টার কোনো কার্পণ্য করা হবে না বলেও জানায় রবিউল।

 

থেমে নেই যাত্রাপথ:
একটা সময়ে ক্ষেতের ধান থেকে চাল তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা রবিউল অনলাইনে সফল মানুষদের কাতারে পৌঁছালেও, রবিউলের নিত্য-নৈমিত্তিক কার্যক্রম চলতে থাকে আগের মতই। সফল থেকে সফলতর হতে এগিয়ে চলার মিশন বর্তমানেও চালিয়ে যাচ্ছে সে।

লেখার কলেবর বেড়ে গেলেও রবিউল সম্পর্কে আরো অনেক গল্পই বলা হয়ে ওঠেনি। সামনের দিনগুলোতে আরো অজানা অনেক তথ্য জানাব আপনাদের। তবে একটা বিষয়ে না বললেই নয়, রবিউল প্রতি মাসে লাখ টাকার উপরে আয় করে এটা দেখে যদি আপনি দ্রুতই টি-স্প্রিং কিংবা অন্য কোনো অনলাইন/অফলাইন প্লাটফর্মে এমনটি করার ইচ্ছা করেন, তাহলে সর্বোচ্চ ভুল সিদ্ধান্তটাই নেয়া হবে!

রবিউলের উক্তি দিয়ে আজকের মতো লেখা শেষ করবো-
“জেদ এবং পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে যে কারো পক্ষেই সফল হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র”

রবিউলের উক্তিটির গভীরতা কতটুকু, বুঝতে পারছেন তো?

 

ফিচার লেখক : আবদুর রহমান সালেহ, বরগুনার মফস্বল সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করছেন বেশ কয়েক বছর যাবৎ। সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করলেও মুলত ফিচার লেখা লেখিতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। সংগ্রামী এবং সম্ভাবনাময় মানুষদের নিয়ে লিখতে এক ধরনের সম্মোহন কাজ করে। লেখা লেখির মাধ্যমে তিনি তুলে নিয়ে আসতে চান অগণিত সম্ভাবনাময় মানুষদের গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *